NID Card

জাতীয় পরিচয়পত্রে তথ্য ভুল হলে যেভাবে সংশোধন করতে হবে

বাংলাদেশ শিক্ষা
সরকারি ও বেসরকারি সেবা পেতে বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্র দরকার হয়। বাংলাদেশে ২০০৮ সাল থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র দেয়া শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে বাংলাদেশে এখন প্রায় এগারো কোটি বেশি মানুষের হাতে জাতীয় পরিচয়পত্র রয়েছে।
কিন্তু প্রায়শই অনেকের কার্ডে নানা ভুলের অভিযোগ পাওয়া যায়। যেমন ভুলের জন্য বাবার বয়স ছেলের চেয়ে পাঁচ বছর কম হয়ে গেছে, মায়ের নামের জায়গায় হয়ে গেছে বাবার নাম।
ফেসবুকে জাতিয় পরিচয়পত্র বিষয়ক বেশ কয়েকটি গ্রুপ রয়েছে। সেখানে অনেকেই সমস্যার বিষয়ে লিখছেন। অনেক সময় ব্যক্তি নিজেই হয়ত ভুলটা করেন অথবা সার্ভারে তথ্য যোগ করার সময়ও হয়ত ভুল হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু তথ্যে একবার ভুল হয়ে গেলে বিভিন্ন রকম বিপাকে পড়তে হয়।
অনেক সময় দেখাযায় বাড়ির ঠিকানা বদল, বৈবাহিক অবস্থার পরিবর্তন ইত্যাদি নানা কারণে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধনের দরকার পড়তে পারে।
ভুলের শিকার এমন কয়েকজনের অভিজ্ঞতা
বিদেশে পড়তে যাওয়ার জন্যে ই-পাসপোর্ট করাতে গিয়েছিলেন মোঃ আরিফুল ইসলাম। পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে জানতে পারলেন অন্যান্য কাগজপত্রের সাথে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি জমা দিতে হবে।
আরিফুর ইসলামের জাতীয় পরিচয়পত্রে একটা হ্রস্ব উ-কার বাদ পড়ায় বাবার নাম হয়ে গেছে ‘নরুল ইসলাম’।
তার রক্তের গ্রুপও ভুল লেখা হয়ে ছিল। অতএব পাসপোর্ট করতে দেওয়ার আগে তাকে এনআইডি সংশোধন করতে হবে।
আরিফুল ইসলাম বলছেন, “তারা যখন বাসায় এসে আমার তথ্য নেয় তখন বাবার জাতীয় পরিচয়পত্র দেখানো হয়েছিল। তাই আমার মনে হয় ভুলটা তারাই করেছেন।”
এই মাসের শুরুর দিকে অনলাইনে বাবার নামের বানান সংশোধনের জন্য কাজ শুরু করেন।
নির্ধারিত ফি জমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সেখানে আপলোড করার দশ দিন পর মেসেজ পেলেন তার জাতীয় পরিচয়পত্রের সংশোধন হয়ে গেছে।
কিন্তু ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলেন সেখানে যে ভুল ছিল সেটাই রয়ে গেছে। হেল্প-লাইনে ফোন করে জানতে পারলেন জাতীয় পরিচয়পত্রের ওয়েবসাইটে ‘টেকনিকাল’ সমস্যা হয়েছে।
এই সপ্তাহে তথ্য সংশোধন হয়েছে বলে জানিয়েছেন আরিফুল ইসলাম।
এনআইডি তথ্য ভুল হলে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়।
ঢাকার বাসিন্দা আরিশা গিয়াস সম্প্রতি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করতে গিয়েছিলেন।
সেখানে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিতে হবে। সেসময় হঠাৎ খেয়াল করে দেখলেন এনআইডি কার্ডে তার বাবার নামের বানান ভুল রয়েছে।
দন্ত্য স বাদ পড়ায় সেখানে গিয়াসউদ্দিন হয়ে গেছে ‘গিয়াউদ্দিন’। এরপর সে তার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রেও ভুল খুঁজে পেলেন।
বাংলায় তার নামের বানান ঠিকই ছিল কিন্তু ইংরেজিতে নামটির বানান হয়েছে ‘দৌলতুনসা’। তিনিও অনলাইনে আবেদন করে তথ্য সংশোধন করেছেন।
যেভাবে এনআইডি তথ্য সংশোধন করতে পারেন
ইতোমধ্যেই নিশ্চয়ই জেনে গেছেন এখন অনলাইনেই সকল তথ্য সংশোধন করার সুযোগ রয়েছে। শুরুতেই এনআইডি পোর্টালে ঢুকে একটি নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে।
সেখানে আপনার এনআইডি নম্বরটি দরকার হবে। অ্যাকাউন্টে ঢুকলে সেখানে অনলাইনে অর্থ পরিশোধের লিংক পাবেন।
রকেট ও ওকে ওয়ালেটের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা যায়। সোনালি ব্যাংকের মাধ্যমেও ফি পরিশোধ করতে পারেন।
জাতীয় পরিচয়পত্রে যেসব তথ্য লেখা থাকে সেগুলোর যেকোনো একটি সংশোধন করতে গেলে প্রথমবার আবেদনের জন্য ২০০ টাকা, দ্বিতীয়বার ৩০০ টাকা এবং পরবর্তী যতবার আবেদন করবেন ৪০০ টাকা ফি দিতে পরিশোধ করতে হবে।
এছাড়া আরও কিছু তথ্য রয়েছে যেগুলো পরিচয়পত্রে উল্লেখ থাকে না। সেগুলোও চাইলে সংশোধন করা যায়।
সেক্ষেত্রে প্রথমবার আবেদনে ১০০ টাকা, দ্বিতীয়বার ৩০০ টাকা এবং পরবর্তীতে প্রতিবার ৩০০ টাকা ফি দিতে হবে।
ফি পরিশোধ করা হয়ে গেলে এডিট করার লিংকে তথ্য চলে যাবে। এরপর আপনি তথ্য সংশোধন করার অপশনে যেতে পারবেন।
সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু কাগজের কপি আপলোড করতে হবে। যা কারণভেদে ভিন্ন হতে পারে।
যেমন নামের ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন, মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার সনদপত্র, পাসপোর্টের কপি, ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য বিদ্যুৎ বা গ্যাস বিলের কাগজ, বিয়ের পর স্বামীর নাম যোগ করতে চাইলে নিকাহনামা, স্বামীর জাতিয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সংযুক্ত করতে হবে, বিবাহ বিচ্ছেদের কারণে স্বামীর নাম বাদ দিতে চাইলে তালাকনামা সংযুক্ত করতে হবে।
কোন ধরনের সংশোধনে কি কি কাগজ লাগবে সেটি ওয়েবসাইটেই দেয়া রয়েছে। ফি পরিশোধের পর তথ্য সংশোধন অনুমোদন হয়ে গেলে আপনি একটি মেসেজ পাবেন।
ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজে নিজেই সংশোধিত এনআইডি প্রিন্ট করে লেমিনেট করে নিতে পারেন।
ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলে যা করতে হবে
বাংলাদেশে সবার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহারের সামর্থ্য নেই। এছাড়া অনেকে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। তাদের জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় থানা নির্বাচন অফিস রয়েছে।
সেখানে দুইজন করে ডাটা এন্ট্রির জন্য লোক রয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র বিভাগের সম্মানিত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম।
“তারাই সবধরনের ডাটা এন্ট্রির জন্য করতে সহযোগিতা করবেন। তাদেরকে সেভাবে বলা আছে। তারা এটা পুরোটাই বিনামূল্যে করবেন। এছাড়া দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন কাউন্সিলে যে ডিজিটাল সেন্টার রয়েছে সেখানেও যাতে নাগরিকেরা অনলাইনে এনআইডি সংক্রান্ত সেবা পান সেই পরিকল্পনা করছি আমরা।”
কিন্তু এসব ভুল কমানোর জন্য কি করা হচ্ছে?
এই প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, যখন প্রথম এনআইডি বিতরণ শুরু হয়েছিল, একদম নতুন একটা কাজ, সেসময় বেশ কিছু ভুল হয়েছিল।
কিন্তু আগের থেকে এখন ভুলের সংখ্যা অনেক কম বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলছেন, এখানে কয়েক ধাপে তথ্য যাচাই হয়।
“জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আবেদনকারী ব্যক্তি নিজে ফর্ম পূরণ করেন। সেই সকল তথ্য সার্ভারে তোলেন একজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। এরপর একজন প্রুফ রিডার সেটা যাচাই বাছাই করেন এবং তারপর সেসব তথ্য সার্ভারে আপলোড করা হয়ে থাকে। আবেদনকারী যখন ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও ছবি দিতে আসবেন সেসময় তাকে একটি প্রিন্ট আউট কপি দেয়া হয় তথ্য যাচাই করার জন্য। সেই কপিতেও সই করেন আবেদনকারী। এই কারণে বর্তমানে ভুলের সংখ্যা খুবই কম।”
এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ওয়েবসাইটে অ্যাকাউন্ট খুলে প্রয়োজনীয় সকল তথ্য ও কাগজ সংযুক্ত করে নতুন এনআইডি কার্ড নিজেই এখন ঘরে বসে করা সম্ভব বলে তিনি জানিয়েছেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.